বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্র যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনই একটি জন্মসনদ বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড এর গুরুত্বও বেড়ে চলেছে। এটি শুধুমাত্র আপনার শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করে না, বরং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আপনার সন্তানের সঠিক পরিচিতি প্রকাশ করতে সহায়তা করে। শিশু জন্মের ০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক এবং এই প্রক্রিয়াটি এখন অনলাইনে করা সম্ভব।
একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে, আপনি যদি আপনার সন্তানের জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে। এখানে আমরা ধাপে ধাপে দেখাবো কীভাবে আপনি সহজে এবং দ্রুত জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে পারবেন। সেই সঙ্গে, আপনার শিশুর জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল তথ্য আপনি পাবেন।
জন্ম নিবন্ধন আবেদন বর্তমানে খুবই সহজ হয়ে গেছে। আপনি চাইলে আপনার হাতে থাকা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই আপনার সন্তানের জন্ম নিবন্ধন আবেদন সম্পন্ন করতে পারেন ঘরে বসেই।
আগে জন্ম নিবন্ধন করতে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় বারবার যেতে হতো। এখন অনলাইনের মাধ্যমে খুব সহজেই আবেদন করা যায়। কিন্তু অনেকেই এখনো জানেন না
- কিভাবে জন্ম নিবন্ধন আবেদন করবেন?
- কী কী কাগজপত্র লাগে?
- কত টাকা লাগে?
- কতদিন সময় লাগে?
- পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলে কী করবেন?
০–৪৫ দিনের শিশুর জন্য:
- টিকা কার্ড (EPI)
- হাসপাতালের ছাড়পত্র (যদি থাকে)
- পিতা-মাতার ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন (বাংলা + ইংরেজি)
- পিতা-মাতার NID
- সচল মোবাইল নম্বর
বর্তমানে পিতা-মাতার ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন না থাকলে নতুন আবেদন গ্রহণ করা হয় না।
মোবাইল দিয়ে জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার নিয়ম
জন্ম নিবন্ধন আবেদন করা খুবই সহজ। এখানে ধাপে ধাপে দেখানো হবে কিভাবে আপনি সহজেই জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারেন।
ধাপ ১: জন্ম নিবন্ধন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে আপনাকে সরকারি জন্ম নিবন্ধন ওয়েবসাইটে যেতে হবে।
আপনি চাইলে গুগলে bdris.gov.bd লিখে সার্চ করতে পারেন অথবা সরাসরিhttps://bdris.gov.bd/ লিংকে ক্লিক করে আবেদন পেজে প্রবেশ করতে পারেন।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর “জন্ম নিবন্ধন আবেদন” অপশন নির্বাচন করুন।

ধাপ ২: জন্ম নিবন্ধন আবেদন অপশন নির্বাচন করুন

উপরের ছবির নির্দেশনা অনুসারে
1. প্রথমে জন্ম নিবন্ধন অপশনটি খুঁজে বের করুন এবং সেখানে ক্লিক করুন।
2. এরপর নিচে থাকা নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন অপশনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: জন্ম নিবন্ধনের ঠিকানা নির্বাচন

এই ধাপে আপনাকে নির্বাচন করতে হবে—আপনি কোন ঠিকানার ভিত্তিতে জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে চান।
আপনি নিচের যেকোনো একটি অপশন নির্বাচন করতে পারবেন:
- জন্মস্থান অনুযায়ী আবেদন
- জন্মস্থান অনুযায়ী আবেদন
- স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী আবেদন
- বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন (প্রবাসীদের জন্য)
আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অপশনে টিক চিহ্ন দিন। এরপর পরবর্তী (Next) বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৪: নিবন্ধিত ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য পূরণ করুন
এই ধাপে আপনাকে যার জন্ম নিবন্ধন করবেন, তার ব্যক্তিগত তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।

নিচের তথ্যগুলো দিতে হবে:
- নামের প্রথম অংশ (বাংলা ও ইংরেজি)
- নামের শেষ অংশ (বাংলা ও ইংরেজি)
- জন্মতারিখ
- পিতা-মাতার কততম সন্তান
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
জন্ম তারিখ বসানোর পর একটি নির্দেশনা বার্তা আসতে পারে, যেখানে আপনার কাছে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে বলা হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই বার্তাটি পড়ে অনুমতি দিন।
প্রতিটি আবশ্যক ঘরের পাশে লাল তারকা চিহ্ন (*) থাকবে, যা অবশ্যই পূরণ করতে হবে।
তথ্য প্রবেশ করানোর সময় বানানের শুদ্ধতা নিশ্চিত করুন, বিশেষ করে নাম ও জন্ম তারিখের ক্ষেত্রে।
ধাপ ৫: জন্মস্থানের ঠিকানা পূরণ করুন
এই ধাপে আপনাকে নিবন্ধনকারীর জন্মস্থানের ঠিকানা সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।

নিচের তথ্যগুলো বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় লিখতে হবে:
- বিভাগ
- জেলা
- উপজেলা
- ওয়ার্ড
- গ্রাম / মহল্লা
- ডাকঘর
সব তথ্য পিতা-মাতার দেওয়া ঠিকানা বা সরকারি কাগজপত্র অনুযায়ী সঠিকভাবে পূরণ করুন। ভুল তথ্য দিলে ভবিষ্যতে সংশোধনের ঝামেলা হতে পারে।
সব তথ্য যাচাই করে তারপর পরবর্তী (Next) বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৬: পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন তথ্য প্রদান করুন
এই ধাপে আপনাকে পিতা ও মাতার জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।

নিচের তথ্যগুলো দিতে হবে:
- জন্ম নিবন্ধন নম্বর
- জন্মতারিখ
- পিতা ও মাতার নাম (বাংলা ও ইংরেজি)
- জাতীয়তা নির্বাচন
পিতা-মাতার নাম অবশ্যই বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় থাকতে হবে। যদি নাম দুই ভাষায় না থাকে, তাহলে আবেদন ভেরিফাই হবে না এবং আপনি পরবর্তী ধাপে যেতে পারবেন না।
সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার পর পরবর্তী (Next) বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৭: স্থায়ী ঠিকানা পূরণ করুন
এই ধাপে আপনাকে জানাতে হবে—স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা কি একই কিনা।
- যদি দুইটি ঠিকানা একই হয়, তাহলে নির্দিষ্ট ঘরে ✔️ টিক চিহ্ন দিন।
- যদি আলাদা হয়, তাহলে বর্তমান ঠিকানার তথ্য আলাদাভাবে পূরণ করুন।

সব তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করে তারপর পরবর্তী (Next) বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৮: বর্তমান ঠিকানা পূরণ করুন
ধাপ ৭ সম্পন্ন করার পরে, আপনাকে বর্তমান ঠিকানা সংক্রান্ত একটি নতুন পেজে নিয়ে আসা হবে।

যদি স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা একই হয়, তাহলে “স্থায়ী ঠিকানার অনুরূপ” অপশনে টিক চিহ্ন দিন। এতে আপনার স্থায়ী ঠিকানার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমান ঠিকানার ঘরগুলোতে বসে যাবে।
যদি বর্তমান ঠিকানা স্থায়ী ঠিকানার থেকে আলাদা হয়, তাহলে নতুন করে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো পূরণ করুন—
ধাপ ৯: আবেদনধীন ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক নির্বাচন করুন
নির্বাচন করুন আবেদনকারী কে:
এই ধাপে আপনাকে নির্বাচন করতে হবে—আবেদনকারী ব্যক্তির সাথে নিবন্ধনকারীর সম্পর্ক কী।
নিচের অপশনগুলো থেকে সঠিকটি নির্বাচন করুন:
- নিজে (যদি আবেদনকারী নিজেই হন)
- পিতা
- মাতা
- অথবা প্রযোজ্য অন্যান্য সম্পর্ক


ধাপ ১০: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন
এই ধাপে আপনাকে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করতে হবে।
সাধারণত যেসব ডকুমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে:
- সন্তানের টিকার কার্ড (শিশুর ক্ষেত্রে)
- পিতা বা মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) — যেকোনো একজনের দিলেই হবে
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
- প্রতিটি ফাইলের সর্বোচ্চ সাইজ ২ মেগাবাইট (2MB) এর মধ্যে হতে হবে।
- ফাইল আপলোড করার সময় ডকুমেন্টের নাম স্পষ্টভাবে লিখুন (যেমন: Father_NID, Vaccine_Card)।
- ঝাপসা বা অস্পষ্ট ছবি আপলোড করবেন না।
সব ডকুমেন্ট সঠিকভাবে আপলোড করার পর পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যান।
ধাপ ১১: আবেদন যাচাই ও নিশ্চিতকরণ
এই ধাপে আপনার আবেদনের সম্পূর্ণ তথ্য পুনরায় যাচাই করার সুযোগ পাবেন। এখানে আপনি যে তথ্যগুলো লিখেছেন , তা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।

যাচাই করার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ:
নাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা, পিতা-মাতার তথ্য এবং আপলোড করা ডকুমেন্ট সঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন।
যেকোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করুন, কারণ আবেদন একবার সাবমিট হয়ে গেলে সংশোধনের জন্য দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ধাপ ১২: OTP ভেরিফিকেশন
এই ধাপে আপনার মোবাইল নম্বর বা ইমেইলের মাধ্যমে OTP (One-Time Password) যাচাই করতে হবে।

ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া:
1. মোবাইল নম্বর বা ইমেইল প্রদান করুন।
2. “OTP পাঠান” অপশনে ক্লিক করুন।
3. আপনার মোবাইল বা ইমেইলে পাঠানো OTP কোডটি নির্ধারিত ঘরে লিখুন।
4. সঠিকভাবে OTP প্রদান করার পর “পরবর্তী” অপশনে ক্লিক করুন।
OTP যাচাই সম্পন্ন হলে, আপনার আবেদন সফলভাবে সাবমিট হবে।
ধাপ ১৩: আবেদন সম্পন্ন ও আবেদন আইডি গ্রহণ

আবেদন সফলভাবে সাবমিট করার পর আপনার আবেদন আইডি পাবেন।
এই আবেদন আইডিটি সংরক্ষণ করুন, কারণ এটি ভবিষ্যতে আবেদনের অগ্রগতি জানতে কাজে লাগবে।
আপনার আবেদন আইডি ব্যবহার করে আবেদন কপি ডাউনলোড করতে পারবেন।
এই ডাউনলোড করা কপিটি আপনার নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভায় জমা দিন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।
এভাবেই আপনি নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন সম্পন্ন করতে পারবেন।
FAQ
জন্ম নিবন্ধন করতে কত টাকা লাগে?
জন্ম নিবন্ধন সাধারণত ০ থেকে ৪৫ দিন বয়সের মধ্যে ফ্রি করা হয়।
এর চেয়ে বেশি বয়স হলে, সরকারি ফি হিসেবে ৫০ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে বা জরুরি ভিত্তিতে আবেদন করলে ফি বৃদ্ধি পেতে পারে, যার পরিমাণ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন অফিসের নীতির উপর নির্ভর করে।
জন্ম নিবন্ধন হতে কতদিন সময় লাগে?
সাধারণভাবে, জন্ম নিবন্ধন আবেদন করার পর ৭ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জন্ম সনদ প্রদান করা হয়।
তবে, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে একটু বেশি সময়ও লাগতে পারে।
জরুরি আবেদন বা দ্রুত সনদ প্রাপ্তির জন্য অতিরিক্ত ফি পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে।
উপসংহার
জন্ম নিবন্ধন আবেদন বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক সহজ। আপনি চাইলে ঘরে বসেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আবেদন করতে পারেন। তবে আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য সঠিকভাবে প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Rasel Ahmed Suja
আমি Nagoriktottho.com-এর প্রতিষ্ঠাতা। পেশাগতভাবে একজন কন্টেন্ট রাইটার, SEO এক্সপার্ট ও ওয়েব ডেভেলপার। পাশাপাশি, ইউনিয়ন পরিষদের চাকরির মাধ্যমে জনগণের সেবায় কাজ করছি। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক তথ্য সহজে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।


