জন্ম নিবন্ধন আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরিচয়পত্র। স্কুল ভর্তি, পাসপোর্ট, ভোটার আইডি, এমনকি চাকরির ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োজন হয়। তবে বিভিন্ন কারণে অনেক সময় জন্ম নিবন্ধনে ভুল তথ্য চলে আসে।
বিশেষ করে জন্ম তারিখ, নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম বা ঠিকানার ভুল ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই ভুল বুঝতে পারলেই দ্রুত সংশোধন করা জরুরি।
বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে করা যায়। মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই আপনি আবেদন করতে পারবেন।
প্রথমত, জন্ম নিবন্ধনের তথ্যই ভবিষ্যতের অন্যান্য সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হয়।
দ্বিতীয়ত, পিতার জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনেক সময় সন্তানের নিবন্ধনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়।
তৃতীয়ত, ভুল তথ্য থাকলে পাসপোর্ট বা NID করতে সমস্যা হয়।
অতএব, সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কী কী লাগে?
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য সমস্যার ধরন অনুযায়ী কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়। যেমন:
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট তালিকা
| সংশোধনের ধরন | যেসব ডকুমেন্ট লাগতে পারে |
|---|---|
| জন্ম তারিখ ভুল হলে | জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), শিক্ষাগত সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট বা হাসপাতালের জন্ম সনদ |
| নাম ভুল হলে | NID, সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট অথবা পিতা-মাতার সঠিক তথ্যসহ প্রমাণপত্র |
| পিতা বা মাতার নাম ভুল হলে | পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন |
| ঠিকানা ভুল হলে | সঠিক ঠিকানার প্রমাণ, যেমন— ইউটিলিটি বিল বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন |
| অন্যান্য তথ্য ভুল হলে | সংশ্লিষ্ট তথ্যের সঠিক সরকারি বা শিক্ষাগত ডকুমেন্ট |
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের ধাপসমূহ
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য এখন আর অফিসে বারবার যেতে হয় না। আপনার হাতে থাকা মোবাইল ফোন অথবা কম্পিউটার ব্যবহার করেই খুব সহজে অনলাইনে আবেদন করা যায়। সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন হয়।
আমি ইউনিয়ন পরিষদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, প্রতিদিন অনেকেই জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য আবেদন করেন। তবে আবেদন করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখা দরকার।
আপনি যে অংশটি সংশোধন করতে চান— যেমন নিজের নাম, জন্মতারিখ বা পিতার নাম— সেই তথ্যটি অবশ্যই সঠিকভাবে লিখতে হবে। বিশেষ করে বানান এবং তারিখ বারবার মিলিয়ে দেখুন, কারণ ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে বা পুনরায় সংশোধন করতে হতে পারে।
তাই আবেদন সাবমিট করার আগে সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন। এখন চলুন ধাপে ধাপে দেখে নেওয়া যাক কীভাবে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করবেন।
ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ
জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের জন্য সবার আগে আপনাকে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। এজন্য সরাসরি এই লিংকে ক্লিক করুন:
https://bdris.gov.bd/br/correction
লিংকে প্রবেশ করলে আপনি জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের নির্দিষ্ট পেজে চলে যাবেন। এছাড়াও চাইলে আপনার ব্রাউজারে এই ঠিকানাটি টাইপ করেও ওয়েবসাইটে যেতে পারেন।
ধাপ ২: জন্ম নিবন্ধন ভেরিফিকেশন

ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর প্রথমে আপনার জন্ম নিবন্ধন তথ্য যাচাই (Verification) করতে হবে। এজন্য নির্দিষ্ট ঘরে আপনার ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ লিখুন। এরপর ক্যাপচা পূরণ করে “অনুসন্ধান” বাটনে ক্লিক করুন।
অনুসন্ধানে ক্লিক করলে আপনার জন্ম নিবন্ধনের সকল তথ্য স্ক্রিনে দেখানো হবে। এখান থেকে ভালোভাবে দেখে নিন— কোন কোন তথ্য আপনি সংশোধন করতে চান এবং আপনার অনলাইন জন্ম নিবন্ধনে বর্তমানে কী তথ্য রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
আবেদন করার আগে জন্ম নিবন্ধনের তথ্যগুলো আপনার ভোটার আইডি কার্ড, শিক্ষাগত সনদ বা পাসপোর্টের সাথে মিলিয়ে নিন। যদি কোথাও ভুল থাকে, তাহলে সেটি আগে থেকেই চিহ্নিত করে রাখুন। এতে পরবর্তীতে সংশোধনের সময় আপনার কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে।
ধাপ ৩: সংশোধনের বিষয় নির্বাচন
এই ধাপে আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে— জন্ম নিবন্ধনের কোন তথ্যটি সংশোধন করতে চান। “সংশোধিত তথ্য নির্বাচন” অপশনে গেলে বিভিন্ন ক্যাটাগরি দেখতে পাবেন।
জন্ম তারিখ সংশোধন:
যদি জন্ম তারিখ ভুল থাকে, তাহলে “জন্ম তারিখ” অপশনটি নির্বাচন করুন। এরপর সঠিক জন্ম তারিখ লিখুন এবং সংশোধনের কারণ হিসেবে “ভুল লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল” অপশনটি সিলেক্ট করুন।
নাম সংশোধন:
নিজের নাম বা পিতা-মাতার নাম ভুল হলে “নাম সংশোধন” অপশনে ক্লিক করে সঠিক বানান লিখুন।
নতুন তথ্য যোগ করা:
জন্ম নিবন্ধনে কোনো তথ্য আগে যুক্ত না থাকলে “আরো তথ্য সংযোজন করুন” অপশনে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য যোগ করতে পারবেন।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সর্বোচ্চ ৫ বার সংশোধন করা যায়। তাই আবেদন করার সময় তথ্যগুলো ভালোভাবে যাচাই করে সঠিকভাবে পূরণ করুন, যাতে বারবার সংশোধনের প্রয়োজন না হয়।
ধাপ ৪: ঠিকানা তথ্য পূরণ ও সংশোধন
এই ধাপে আপনাকে আপনার বর্তমান ঠিকানা এবং স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে লিখতে হবে। জন্ম নিবন্ধনে ঠিকানা সংক্রান্ত কোনো ভুল থাকলে এখান থেকেই তা সংশোধন করা যায়।
অনেক সময় জন্ম নিবন্ধনের এলাকার তথ্য হালনাগাদ না থাকায় অনলাইন থেকে সনদ প্রিন্ট করা যায় না। তাই জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের সময় ঠিকানার সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করা জরুরি। ঠিকানায় কোনো বানান ভুল থাকলে সেটিও অবশ্যই সংশোধন করে নিন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়।
যে তথ্যগুলো দিতে হবে:
- বিভাগ
- জেলা
- উপজেলা
- ইউনিয়ন / পৌরসভা
- ওয়ার্ড
- গ্রাম / মহল্লা
- ডাকঘর
- প্রতিটি তথ্য বাংলা এবং ইংরেজি – দুই ভাষাতেই লিখতে হবে।
ধাপ ৫: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন
সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার পর একবার ভালোভাবে রিভিউ করুন। এরপর আপনার সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করতে হবে।
জন্মতারিখ সংশোধন: টিকা কার্ড, শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা পাসপোর্টের স্ক্যান কপি দিন।
নিজের নাম সংশোধন: জাতীয় পরিচয়পত্র, স্কুল সার্টিফিকেট বা এডমিট কার্ড আপলোড করুন।
পিতার নাম সংশোধন: পিতার জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করুন।
ডকুমেন্ট আপলোড করার সময় অবশ্যই নির্ধারিত ডকুমেন্টের নাম নির্বাচন করুন এবং ফাইল যেন পরিষ্কার ও পড়ার উপযোগী হয় তা নিশ্চিত করুন। সবকিছু সম্পন্ন হলে আবেদন সাবমিট করুন।
ধাপ ৬: আবেদনকারীর তথ্য পূরণ ও আবেদন সাবমিট
এই ধাপে আপনাকে আবেদনকারীর তথ্য পূরণ করতে হবে। যদি আবেদনকারী নিজে হন, তাহলে “নিজ” অপশনটি নির্বাচন করুন। আর যদি পিতা আবেদন করেন, তাহলে “পিতা” অপশনটি সিলেক্ট করুন।
এরপর একটি সচল মোবাইল নম্বর দিন। অবশ্যই নিজের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করা ভালো, কারণ ভবিষ্যতে যোগাযোগ ও যাচাইকরণের জন্য এই নম্বরটি গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল নম্বর দেওয়ার পর OTP অপশনে ক্লিক করুন। আপনার ফোনে আসা ওটিপি কোডটি নির্ধারিত স্থানে লিখে Submit বাটনে ক্লিক করলে আবেদনটি সফলভাবে সম্পন্ন হবে।
আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর আবেদন আইডি সংরক্ষণ করুন। পরবর্তীতে এই আইডি ব্যবহার করে আবেদন কপি প্রিন্ট করতে পারবেন।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
আবেদন সাবমিট করার আগে সকল তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নিন। কারণ একবার সাবমিট হয়ে গেলে ভুল থাকলে আবেদন বাতিল করে নতুন করে আবেদন করতে হতে পারে।
প্রিন্ট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আপনার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দিন। যাচাই শেষে আপনার জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা হবে।
জন্ম তারিখ সংশোধন জন্ম নিবন্ধন
জন্ম তারিখ ভুল হলে দ্রুত সংশোধন করা উচিত।
প্রথমে ওয়েবসাইটে গিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করুন।
তারপর “জন্ম তারিখ সংশোধন” নির্বাচন করুন।
সঠিক জন্ম তারিখ লিখুন।
পরবর্তী ধাপে জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সার্টিফিকেট বা প্রাসঙ্গিক প্রমাণপত্র স্ক্যান কপি আপলোড করে OTP যাচাইয়ের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করা যায়। আবেদন সফলভাবে জমা দেওয়ার পর আবেদন কপিটি প্রিন্ট করে নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা কার্যালয়ে জমা দিলে জন্ম নিবন্ধনের জন্ম তারিখ সংশোধন হয়ে যাবে।
জন্ম নিবন্ধনের নিজের নাম সংশোধন
জন্ম নিবন্ধনের নামে ভুল হয়েছে—এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন? এখন আর দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। বর্তমানে আপনি খুব সহজেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের নাম সংশোধন করতে পারবেন।
নাম সংশোধনের জন্য প্রথমে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। এরপর জন্ম নিবন্ধনে যে অংশে নামের ভুল রয়েছে, সেই নাম সংশোধন অপশনটি নির্বাচন করুন এবং সেখানে আপনার সঠিক নাম লিখুন। যে ডকুমেন্টে আপনার নাম সঠিক আছে—যেমন জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ বা পাসপোর্ট—সেই ডকুমেন্টের স্ক্যান কপি সংযুক্ত করতে হবে।
পরবর্তী ধাপে সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে OTP ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করুন। আবেদন শেষ হলে আবেদন কপিটি প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ নিকটতম ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
FAQ (সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর)
সাধারণত ৫–৭ কার্যদিবস সময় লাগে।
তবে এলাকাভেদে সময় কম-বেশি হতে পারে।
সাধারণত:
সাধারণ ফি: ১০০ – ২০০ টাকা
জরুরি সংশোধন: অতিরিক্ত ফি প্রযোজ্য
তবে ফি ইউনিয়ন বা পৌরসভাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ বার সংশোধনের সুযোগ থাকে।
তাই আবেদন করার আগে তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন।
না। আবেদন অনলাইনে করা যায়। তবে প্রিন্ট কপি অফিসে জমা দিতে হয়।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায়, জন্ম নিবন্ধন সংশোধন এখন আর জটিল কোনো প্রক্রিয়া নয়। সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে খুব সহজেই অনলাইনে আবেদন করা যায়। তবে আবেদন করার আগে প্রতিটি তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ একবার সাবমিট করার পর ভুল থাকলে পুনরায় আবেদন করতে হতে পারে।
বিশেষ করে জন্ম তারিখ, নিজের নাম এবং পিতা-মাতার তথ্য অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ বা পাসপোর্টের সাথে মিলিয়ে নিন। এতে ভবিষ্যতে পাসপোর্ট, ভোটার আইডি বা অন্যান্য সরকারি সেবায় কোনো জটিলতা তৈরি হবে না।
অতএব, জন্ম নিবন্ধনে কোনো ভুল থাকলে দেরি না করে দ্রুত সংশোধনের আবেদন করুন। সঠিক তথ্যই আপনার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখবে।



